স্টাফ রিপোর্টার।। কুলাউড়ার দর্পণ
আইন ও নিয়মের তোয়াক্কা না করে ভারত থেকে পুশইন (ঠেলে পাঠানো) চলছেই। কোনো না কোনো সীমান্ত দিয়ে প্রায় প্রতিদিন ওপার থেকে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ভারত থেকে ঠেলে পাঠানো রোহিঙ্গার সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। তারা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ট্রানজিট ক্যাম্প ও স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। সব মিলিয়ে গতকাল শনিবার পর্যন্ত পুশইন করা হয়েছে এক হাজার ৯০১ জনকে।
শনিবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত ৭ মে প্রথম পুশইন শুরু করে ভারত। এ ধরনের বিস্তৃত মাত্রায় ঠেলে পাঠানোর নজির নিকট অতীতে দেখা যায়নি। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার নিন্দা ও উদ্বেগের মধ্যে বন্ধ হচ্ছে না এ কার্যক্রম। এক দেশের কোনো নাগরিক অন্য দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ করলে তাঁকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন অনুসরণ করে ফেরত পাঠাতে হয়। আইন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ না করেই চলছে পুশইনের ঘটনা। ফেরত আসা অনেকে নিপীড়নের গুরুতর অভিযোগ করেছেন। কারও শরীরে নির্যাতনের চিহ্নও দেখা গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন সীমান্ত হয়ে ঠেলে পাঠানো রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে। পৃথিবীর সবাই জানে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। ডাম্পিং জোন হিসেবে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া বেআইনি। এর মাধ্যমে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিজিবিসহ সীমান্তসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূত্র থেকে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত পুশইন করা এক হাজার ৯০১ জনের মধ্যে মৌলভীবাজার সীমান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ৫০২ জনকে ঠেলে দেওয়া হয়। এছাড়া সিলেট সীমান্ত দিয়ে ২৫০, খাগড়াছড়ি ১৬০, লালমনিরহাট ১২৮, পঞ্চগড় ১১৪, সাতক্ষীরা ১১০, কুড়িগ্রাম ৯১, ঠাকুরগাঁও ৭৫, ফেনী ৬৭, সুনামগঞ্জ ৫৩, ঝিনাইদহ ৫২, মেহেরপুর ৫০, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ও হবিগঞ্জে ৪৩ জন করে, নেত্রকোনা ৩২, ময়মনসিংহ ৩১, চুয়াডাঙ্গা ২৫, কুমিল্লা ১৩, কুষ্টিয়া ৯, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৭ ও নওগাঁয় একজনকে ঠেলে দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তাদের মধ্যে ৭৮ জন কোস্টগার্ড আটক করেছে। ২৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
গত শুক্রবার পঞ্চগড়ের দুই সীমান্ত দিয়ে আবারও নারী, শিশুসহ ১৫ জনকে পুশইন করে বিএসএফ। ওইদিন গভীর রাতে নীলফামারী ৫৬ বিজিবির আওতাধীন উপজেলা সদরের চাকলাহাট ইউনিয়নের খুনিয়াপাড়া ও অমরখানা ইউনিয়নের অমরখানা সীমান্ত দিয়ে তাদের পুশইন করা হয়। পঞ্চগড় সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ হিল জানান, এ ব্যাপারে তারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিক কিনা, এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে গতকাল শিশুসহ ৬ জনকে পুশইন করা হয়েছে। উপজেলার বৈরচুনা সীমান্তের ৩৩৫/৩ এস পিলার এলাকা দিয়ে তাদের দেশে ঠেলে দেন বিএসএফ সদস্যরা।
আরেকটি সূত্র জানায়, ভারত থেকে তিন ধরনের রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। দুই শতাধিক রোহিঙ্গার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একটি বড় অংশের কাছে ভারতে ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধনের কাগজপত্র আছে, এ সংখ্যা শতাধিক। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সদস্য, তবে বাংলাদেশ ও ভারত কোনো দেশের ইউএনএইচসিআরের কাগজপত্র নেই এমন রোহিঙ্গাও রয়েছে। বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যাও আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে কোনো নাগরিককে পুশইন করা পুরোপুরি বেআইনি। বৈধ কাগজপত্র না থাকলে তাদের আদালতে সোপর্দ করতে পারেন। আদালতের রায় পেলে সে অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ করণীয় নির্ধারণ করবে।
গত ৩ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ভারত থেকে বাস্তবিক অর্থে ‘পুশইন’ ঠেকানো সম্ভব নয়। দুই দেশের বিদ্যমান কনস্যুলার সংলাপের মাধ্যমে এ সমস্যাকে একটি প্রক্রিয়া অনুযায়ী সুরাহা করা যায় কিনা, সে বিষয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের উমেদ আলী ও তাঁর পরিবারের ৫ সদস্যকে সম্প্রতি খাগড়াছড়ি সীমান্ত দিয়ে পুশইন করা হয়েছে। উমেদের বড় ভাইয়ের মেয়ে পলি খাতুন সমকালকে বলেন, ১০ বছর আগে তাঁর চাচা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে যান। হরিয়ানার ইটভাটায় কাজ করতেন। তাদের সংসারের সব জিনিসপত্র ও টাকা-পয়সা রেখে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, যাদের পুশইন করা হচ্ছে তারা কখন অনুপ্রবেশ করল, কেন এখন ফেরত পাঠাচ্ছে এসব জানা দরকার। কূটনৈতিক জোরালো তৎপরতা দৃশ্যমান করা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গেও মমতা ব্যানার্জিসহ অনেকে এর প্রতিবাদ করছেন। পুশ করে আন্তর্জাতিক আইন, রীতিনীতি ও কনভেনশন লঙ্ঘন করা হচ্ছে। কারণ যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তারা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বাস করছেন। এখন সেখানে বসবাসকারী বাংলাভাষী মানুষ ও রোহিঙ্গাদের গণহারে বাংলাদেশে পুশইন করা হচ্ছে।
ভারতের মানবাধিকারকর্মী কিরীটী রায় বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিচার বিভাগকে জানাতে হবে। বিচারক স্থির করবেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বেআইনিভাবে এসেছেন, না অন্য কিছু। যদি বেআইনিভাবে আসেন তাহলে তাঁকে যে দেশ থেকে এসেছেন, সেখানে আইনসম্মতভাবে রিপ্যাট্রিয়েশন করতে হবে। যেটি ভারত সরকার করছে না। শুধু মুসলিম দেখেই তাদের ধরা হচ্ছে, বিচার বিভাগকে এড়িয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। যেটি ভারতের সংবিধান ও আইনবিরোধী।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির আর্টিকেল ১৩ অনুসারে, কোনো দেশে বৈধভাবে থাকা ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া সেই দেশ থেকে বের করে দেওয়া যায় না। আর্টিকেল ১২(৪) অনুসারে, কোনো ব্যক্তিকেই তাঁর নিজ দেশে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির মতে, এ বিধান বৈধ নাগরিকদের পাশাপাশি যাদের বৈধ নাগরিকত্বের কাগজপত্র নেই তবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো দেশে বাস করছেন তাদের জন্যও প্রযোজ্য। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই এই আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করেছে। সূত্র: সমকাল
সম্পাদক: ময়নুল হক পবন, প্রকাশক: রিয়াজুল হক রেজা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোহাম্মদ জয়নুল হক.
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়,কামাল প্লাজা (১ম তলা), কুলাউড়া, মৌলভীবাজার,ফোন: ০১৭১১-৯৮৩২৬৯
ঠিকানা: 𝐃𝐮𝐛𝐚𝐢 𝐈𝐧𝐯𝐞𝐬𝐭𝐦𝐞𝐧𝐭 𝐩𝐚𝐫𝐤 𝐃𝐈𝐏, 𝐀𝐥 𝐁𝐚𝐲𝐚𝐧 𝐁𝐮𝐢𝐥𝐝𝐢𝐧𝐠 𝟐𝟎𝟏𝟏, 𝐏.𝐎 𝟏𝟎𝟎𝟏𝟐𝟏- 𝐃𝐮𝐛𝐚𝐢. সংবাদ, ছবি ও বিজ্ঞাপন পাঠানোর ঠিকানা: Email: kulauradorpon@gmail.com ওয়েবসাইট: www.kulaurardarpan.com,
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত