স্টাফ রিপোর্টার।। দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও সুযোগ পাননি আসিফ মোক্তাদির। তিনিই এখন পড়তে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে। বিষয় স্বাস্থ্যনীতি। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ডাক এসেছিল। সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়লেখা এই তরুণ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিখ্যাত আইভি লিগভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তাব পেলেন?
বড়লেখার ছেলেটি
আসিফের জন্ম ১৯৯৬ সালে, মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায়। বাবা মোক্তাদির হোসেন ও মা জান্নাতুল ফেরদৌস। ছোটবেলায় ভীষণ চঞ্চল ছিলেন। আলমারি থেকে লাফিয়ে বিছানায় পড়া, পুকুরঘাটে পড়ে যাওয়া, টিউবওয়েলের হাতলে লেগে মাথা ফাটা—এসব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তবে পড়ালেখার বেলায় চিত্রটা একদম উল্টো। নিজ আগ্রহেই পড়তেন। পড়াশোনার জন্য কখনো বকা খেতে হয়নি।
রোকেয়া খাতুন লাইসিয়াম স্কুলে শিক্ষাজীবনের শুরু। পাথারিয়া ছোটলিখা সরকারি মডেল উচ্চবিদ্যালয় থেকে সব বিষয়ে এ–প্লাস পেয়ে ভর্তি হন জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। উচ্চমাধ্যমিকেও ফল একই রকম—সব বিষয়ে এ–প্লাস। হোস্টেলজীবন ছিল তাঁর জীবনের বড় শিক্ষা। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, জাফলং ভ্রমণ, রাতের আকাশের নিচে গল্প, শহুরে স্বাধীনতা—সব মিলিয়ে সেই দুই বছর তাঁকে বদলে দেয়। জীবন যে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, আসিফ তখন থেকেই উপলব্ধি করেন।
ব্যর্থতার সাত অধ্যায়
ছোটবেলা থেকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু পারিবারিক ভিসাপ্রক্রিয়াধীন থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরিবারের সিদ্ধান্তেই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি–কোচিং করতে ঢাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু মন বসেনি। গণিতের সূত্র আর সরলরেখা তাঁকে টানেনি।
প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) ও ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে (আইইউটি) ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও কোথাও সুযোগ হয়নি। ফল প্রকাশের পরই মেধাতালিকার শেষ দিক থেকে নিজের নাম খুঁজতেন আসিফ। কিন্তু হতাশ হতে হয়েছে প্রত্যেকবার।
আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, সমাজের চাপ, নিজের ভেতরের হতাশা মিলিয়ে কঠিন একটা সময় গেছে। আসিফ বলেন, ‘সেই সময় মনে হতো জীবনে আর কোনো সুযোগ নেই। মানুষের নানা প্রশ্ন ও কৌতূহলের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে বাইরে বের হতেই অস্বস্তি লাগত।’
তবে হাল ছাড়েননি। দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে সুযোগ পান আসিফ মোক্তাদির। সে সময় তাঁর মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ অন্ধকারের পর বুঝি একটু আলো দেখা যাচ্ছে।
নতুন দেশ, নতুন সংগ্রাম
শাবিপ্রবিতে তিন সেমিস্টার পড়ার পর পরিবারের সুবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা হাতে আসে। আবার দোটানা। দেশে থেকে পড়া শেষ করবেন, নাকি নতুন করে শুরু করবেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
শুরুটা সহজ ছিল না। প্রথম কাজ ছিল একটা কফির দোকানে। সারা দিন দাঁড়িয়ে কাজ করা, কফি বানানো, স্যান্ডউইচ বানানো...আবর্জনা ফেলতে গিয়ে কয়েক মিনিট শুধু ফোন দেখার সুযোগ পেতেন। সেই সময়টুকুই ছিল নিজের সঙ্গে থাকার মুহূর্ত।
আত্মীয়দের কেউ কেউ বলতেন, এত পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত কফির দোকানে কাজ করতে হচ্ছে! এই কথাগুলোই মাকে কষ্ট দিত। বাসায় ফিরে আসিফ মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছেন বহুবার।
শেষ পর্যন্ত মা-বাবার সহায়তা ও অনুপ্রেরণাতেই ভর্তি হন বাফেলো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। নতুন করে শুরু হয় পড়াশোনা। এবার বিষয় বায়োলজিক্যাল সায়েন্স। প্রথম সেমিস্টারে ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। জিপিএ ছিল ২ দশমিক ৬৭। ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ই আসিফ নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, আর কখনো পড়াশোনায় অবহেলা করবেন না। তারপর? পরপর তিন সেমিস্টারে ডিনস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন তিনি। বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে মেজর, রসায়নে মাইনরসহ সম্পন্ন হয় তাঁর স্নাতক।
চিকিৎসা থেকে স্বাস্থ্যনীতি
যুক্তরাষ্ট্রে ডাক্তার হতে দীর্ঘ সময় লাগে। আসিফ মোক্তাদির তাই বিকল্প হিসেবে বেছে নেন ‘ফিজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েট’ ডিগ্রি। মাস্টার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে প্রাইমারি কেয়ার ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন তিনি।
উন্নত দেশেও স্রেফ ভাষা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কত মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, একজন অভিবাসী হিসেবে সেটা কাছ থেকে দেখেছেন আসিফ। ফলে তাঁর উপলব্ধি হয়েছে, বৃহত্তর পরিবর্তনের জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করা দরকার। সে জন্যই হার্ভার্ড ও কলাম্বিয়ায় আবেদন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ডের স্বাস্থ্যনীতি বেছে নিয়েছেন। কারণ, তিনি এমন একটা স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন, যেখানে অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমানভাবে মানসম্মত চিকিৎসা পাবে।
লেখালেখি ও সামাজিক উদ্যোগ
অভিবাসীজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে স্নাতকে পড়ার সময়েই আসিফ দুটি বই লিখেছেন—সম্ভাবনার দেশে স্বপ্নজয় এবং আমেরিকার বৃত্তান্ত। বইগুলোয় নতুন অভিবাসীদের জন্য তথ্যভিত্তিক দিকনির্দেশনা আছে।
‘অ্যাচিভ’ নামে একটি অলাভজনক শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মও প্রতিষ্ঠা করেছেন এই তরুণ। বিভিন্ন স্কুলে অনুপ্রেরণামূলক সেশন পরিচালনা, তরুণদের দিকনির্দেশনা দেওয়া তাঁর স্বপ্ন। রেফারাল অ্যাসিস্ট নামে একটি ওয়েবভিত্তিক উদ্যোগও চালু করেছেন, যার মাধ্যমে রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ নিতে পারেন।
অবহেলিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় কাজের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কংগ্রেস পরিচালিত ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস কর্পস স্কলারশিপ পেয়েছেন আসিফ। পাশাপাশি মাদার ক্যাব্রিনি হেলথ ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছেন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলারের বৃত্তি।
পেছনে তাকিয়ে আসিফ এখন ভাবেন, কী কঠিন একটা সময়ই না গেছে! সে সময় যদি ভেঙে পড়তেন, আজ হয়তো পথ তাঁকে অন্য কোথাও নিয়ে যেত।
সম্পাদক: ময়নুল হক পবন, প্রকাশক: রিয়াজুল হক রেজা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোহাম্মদ জয়নুল হক.
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়,কামাল প্লাজা (১ম তলা), কুলাউড়া, মৌলভীবাজার,ফোন: ০১৭১১-৯৮৩২৬৯
ঠিকানা: 𝐃𝐮𝐛𝐚𝐢 𝐈𝐧𝐯𝐞𝐬𝐭𝐦𝐞𝐧𝐭 𝐩𝐚𝐫𝐤 𝐃𝐈𝐏, 𝐀𝐥 𝐁𝐚𝐲𝐚𝐧 𝐁𝐮𝐢𝐥𝐝𝐢𝐧𝐠 𝟐𝟎𝟏𝟏, 𝐏.𝐎 𝟏𝟎𝟎𝟏𝟐𝟏- 𝐃𝐮𝐛𝐚𝐢. সংবাদ, ছবি ও বিজ্ঞাপন পাঠানোর ঠিকানা: Email: kulauradorpon@gmail.com ওয়েবসাইট: www.kulaurardarpan.com,
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত