মানসিক রোগ লজ্জা নয়, চিকিৎসাযোগ্য বাস্তবতা”
মানসিক রোগ কোনো দুর্বলতা নয়, নয় অবহেলার বিষয়। আজকের পৃথিবীতে মানসিক স্বাস্থ্যসংকট এক নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (World Health Organization) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ৮ জনে ১ জন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তাই বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত।
বাংলাদেশেও প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু-কিশোর মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগের উপসর্গ নিয়ে জীবনযাপন করছেন। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) মারাত্মকভাবে অপ্রতুল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
উদাহরণস্বরূপ, উন্নত দেশ England–এর কথা ধরা যাক। প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষের এই দেশটিতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) রয়েছেন আনুমানিক ১০ হাজার জন। অর্থাৎ, প্রতি ৭,৫০০ মানুষের জন্য রয়েছেন মাত্র একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন মাত্র ৩০০ জনের মতো। অর্থাৎ, প্রায় ৬ লাখ মানুষের জন্য রয়েছেন মাত্র একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। এই বিশাল বৈষম্যই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বাংলাদেশে এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো মানসিক রোগীদের প্রতি সামাজিক অবহেলা, কুসংস্কার ও অসচেতনতা। আমাদের সমাজে এখনো মানসিক রোগীকে “পাগল” বলে অপমান করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে “ভূতে ধরা” বা “জ্বীনের আসর” বলেও মনে করা হয়। চিকিৎসার নামে ভণ্ড মোল্লা, পীর কিংবা কবিরাজদের ঝাড়ফুঁক ও নির্যাতনের শিকার হন অসংখ্য রোগী। ফলে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা বিলম্বিত হয়, বাড়ে রোগীর কষ্ট এবং নষ্ট হয় মূল্যবান সময়।
মানসিক রোগগুলোর মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া অন্যতম জটিল, তবে চিকিৎসাযোগ্য, নিরাময় যোগ্য একটি রোগ।
বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত অর্থাৎ প্রতি ৩৪৫ জনে প্রায় ১ জন। বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ লাখ মানুষ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দুঃখজনকভাবে, অধিকাংশ রোগী এখনো আধুনিক চিকিৎসাসেবার বাইরে রয়ে গেছেন।
আমাদের সমাজে এখনো অনেকে সিজোফ্রেনিয়াকে “পাগলামি”, “জ্বীনে ধরা” কিংবা অলৌকিক কোনো বিষয় বলে মনে করেন। অথচ এটি মূলত ব্রেইনের নিউরোট্রান্সমিটার, ডোপামিন-সেরোটোনিন-এপিনেফ্রিন এর ভারসাম্যহীনতার ফলে সৃষ্ট একটি গুরুতর মানসিক রোগ, যা অসংলগ্ন চিন্তা, আচরণ ও কথাবার্তার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।
সময়মতো সঠিক চিকিৎসা, পরিবারের সহযোগিতা এবং সামাজিক সহমর্মিতা পেলে একজন রোগী আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এর বাস্তব উদাহরণ হলেন নোবেলজয়ী বিখ্যাত মার্কিন গণিতবিদ জন ন্যাশ (John Nash)।
জন ন্যাশ দীর্ঘদিন সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে লড়াই করেও পরিবারের ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে তিনি জীবনে সফলতা অর্জন করেন এবং ১৯৯৪ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি যুগান্তকারী “ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম” তত্ত্বের প্রবক্তা।
সিজোফ্রেনিয়া রোগের চিকিৎসা কি?
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডোপামিন (Dopamine) নিউরোট্রান্সমিটার রিসেপ্টর-ব্লকার এন্টিসাইকোটিক (Antipsychotic) ওষুধ, মনোসামাজিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের ভালোবাসা—সব মিলিয়েই সিজোফ্রেনিয়া রোগীকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, রোগীর শুধু ওষুধ নয়; প্রয়োজন সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা ও মানবিক আচরণ। প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আরও বেশি সাইকিয়াট্রিস্ট ও কাউন্সেলর তৈরির কার্যকর উদ্যোগ। নইলে এই নীরব মহামারি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
গতকাল ২৪ মে বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস। প্রতিবছর সারা বিশ্বে এই দিন সিজোফ্রেনিয়া সচেতনতা দিবস হিসেবে পালন হয়ে থাকে।
মানসিক রোগীর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার হোক, অবহেলা নয়, চাই সহমর্মিতা ও ভালোবাসার উষ্ণ পরশ। সহমর্মিতা ও ভালোবাসা কখনো কখনো ওষুধের মতোই শক্তিশালী।
ডা. সাঈদ এনাম
সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি)
সম্পাদক: ময়নুল হক পবন, প্রকাশক: রিয়াজুল হক রেজা, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : মোহাম্মদ জয়নুল হক.
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়,কামাল প্লাজা (১ম তলা), কুলাউড়া, মৌলভীবাজার,ফোন: ০১৭১১-৯৮৩২৬৯
ঠিকানা: 𝐃𝐮𝐛𝐚𝐢 𝐈𝐧𝐯𝐞𝐬𝐭𝐦𝐞𝐧𝐭 𝐩𝐚𝐫𝐤 𝐃𝐈𝐏, 𝐀𝐥 𝐁𝐚𝐲𝐚𝐧 𝐁𝐮𝐢𝐥𝐝𝐢𝐧𝐠 𝟐𝟎𝟏𝟏, 𝐏.𝐎 𝟏𝟎𝟎𝟏𝟐𝟏- 𝐃𝐮𝐛𝐚𝐢. সংবাদ, ছবি ও বিজ্ঞাপন পাঠানোর ঠিকানা: Email: kulauradorpon@gmail.com ওয়েবসাইট: www.kulaurardarpan.com,
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত