
স্কুল বা বাসাবাড়িতে কোমলপ্রাণ শিশুদের “মানুষ করার” নামে শারীরিক নির্যাতন—এটি বহু সমাজে এখনো প্রচলিত থাকলেও আধুনিক বিজ্ঞান একে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেয় না। গবেষণাগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, শারীরিক শাস্তি শিশুদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে না; বরং তাদের মানসিক, সামাজিক ও জৈবিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। এমনকি এর ফলে অনেক শিশু পরিণত বয়সে নানান মানসিক রোগে ভোগে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শারীরিক শাস্তি শিশুদের মধ্যে ভয়, লজ্জা, রাগ ও অনিরাপত্তা তৈরি করে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আচরণগত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, শিশুকে “ভালো মানুষ” বানানোর বদলে এটি তার মানসিক স্থিতিশীলতাকেই দুর্বল করে এবং ক্ষেত্রবিশেষে শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু শারীরিক আঘাত নয়, শিশুকে উদ্দেশ্য করে কটুকথা, তীর্যক মন্তব্য, নিন্দাসূচক উপনাম বা অন্যদের সঙ্গে তুলনা—এসবও তাদের স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায়।
একটি বৃহৎ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় (৬৯টি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা) দেখা গেছে—শারীরিক শাস্তি শিশুদের আচরণ উন্নত করে না; বরং তা আচরণগত সমস্যা বাড়ায়। এই ফলাফলটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেকের ধারণা মারধর করলে শিশুর আচরণ “ঠিক” হয়—বাস্তবে তার উল্টোটি ঘটে।
এছাড়া, শারীরিক শাস্তির সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে মানসিক রোগের ঝুঁকিও যুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে এমন অভিজ্ঞতা থাকলে পরবর্তীতে বিষণ্নতা, আসক্তি ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্যেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে। বরং এটি শিশুর মধ্যে আগ্রাসন, সহিংসতার গ্রহণযোগ্যতা এবং দুর্বল আত্মসম্মান তৈরি করে।
সুতরাং, শিশুদের শারীরিক নির্যাতন করে “মানুষ” করা বা সু অভ্যাস প্রতিষ্ঠিত করা যায় না; বরং তাদের সুস্থ মানুষ হওয়ার পথে বাধা তৈরি করা হয়।
শৈশবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিণত বয়সে নানা মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গুরুত্বপূর্ণ ৭টি হলো—
★পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডার, Post-Traumatic Stress Disorder (PTSD)
ট্রমার স্মৃতি বারবার ফিরে আসা, দুঃস্বপ্ন, অতিরিক্ত ভয় ও সতর্কতা।
★মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, Major Depressive Disorder
দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ, আগ্রহ হারানো, হতাশা ও শক্তিহীনতা।
★জেনারেলাইজড এনজাইটি ডিসওর্ডার, Generalized Anxiety Disorder
অকারণ দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা ও টেনশন।
★বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, Borderline Personality Disorder
আবেগের অস্থিরতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়।
★মাদকাসক্ত, Substance Use Disorder
মাদক বা অ্যালকোহলের ওপর নির্ভরশীলতা।
★ডইসোসিয়েটিভ ডিসওর্ডার, Dissociative Disorders
বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা, নিজের পরিচয় বা স্মৃতিতে সমস্যা।
★অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসওর্ডার, Obsessive-Compulsive Disorder বারবার চিন্তা (obsession) ও বাধ্যতামূলক আচরণ (compulsion)।
শৈশবের কোমল মনে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের বীজ বপন করতে—অভিভাবক ও শিক্ষকদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, শিশুর মানসিক বিকাশে বা আচরণ গঠনে পজেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট, ইতিবাচক প্রণোদনা (positive reinforcement) ও নিগেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট, নেতিবাচক প্রণোদনা (negative reinforcement) সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর মধ্যে অন্যতম।
পজেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট, ইতিবাচক প্রণোদনা (positive reinforcement) ও নিগেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট, নেতিবাচক প্রণোদনা (negative reinforcement) কী?
পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট (ইতিবাচক প্রণোদনা):
কোনো কাঙ্ক্ষিত আচরণের পর শিশুকে একটি সুখকর বা পছন্দের বিষয় ‘দেওয়া’ বা ‘যোগ করা’, যাতে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে। উদাহরণ: শিশু স্কুলে ভালো ফল করল → বাবা-মা তাকে একটি গল্পের বই উপহার দিলেন (অর্থাৎ পুরস্কার যোগ করা হলো)।
নেগেটিভ রিইনফোর্সমেন্ট (নেতিবাচক প্রণোদনা):
কোনো কাঙ্ক্ষিত আচরণের পর শিশুর জন্য একটি অপ্রীতিকর বা বিরক্তিকর বিষয় ‘সরিয়ে নেওয়া’ বা ‘বাদ দেওয়া’, যাতে সেই আচরণটি আরও শক্তিশালী হয় এবং পুনরাবৃত্তি ঘটে। উদাহরণ: একটি শিশু পড়াশোনা না করলে তাকে প্রতিদিন অতিরিক্ত অনুশীলনী দেওয়া হতো। কিন্তু সে নিয়মিত পড়া শুরু করলে সেই অতিরিক্ত হোম ওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হলো। অর্থাৎ অপছন্দনীয় বিষয়টি সরিয়ে নেওয়ায় পড়ার অভ্যাসটি আরও দৃঢ় হলো।
ডা. মো. সাঈদ এনাম
(ডিএমসি, বিসিএস)
সহযোগী অধ্যাপক সাইকিয়াট্রি
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।
[ইন্টারন্যাশনাল ফেলো : আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন।]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।